জেলা সফরে গিয়ে প্রতি দিন বিজেপিকেই নিশানা করছেন অভিষেক। বৃহস্পতিবারও তার ব্যত্যয় হয়নি। তবে মালদহ জেলায় প্রচারে গিয়ে বিজেপির পাশাপাশি কংগ্রেসকেও নিশানা করেছেন তিনি। যা বিধানসভা ভোটের প্রচারে ‘তাৎপর্যপূর্ণ’।
মালদহে নির্বাচনী প্রচারে গিয়ে বিজেপির পাশাপাশি কংগ্রেসকেও নিশানা করলেন তৃণমূলের ‘সেনাপতি’ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। সরাসরি মালদহ উত্তরের কংগ্রেস সাংসদ ঈশা খান চৌধুরীর নাম করে তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদকের প্রশ্ন, পরিযায়ী শ্রমিকদের জন্য তিনি কী কাজ করেছেন? মালদহের পাশের জেলা মুর্শিদাবাদের নিলম্বিত (সাসপেন্ডেড) তৃণমূল বিধায়ক হুমায়ুন কবীরের নাম না-করে তাঁকেও নিশানা করেছেন অভিষেক। তবে আইপ্যাকের দফতর এবং সংস্থার কর্ণধার প্রতীক জৈনের বাড়িতে ইডি অভিযান এবং তার পরবর্তী পরিস্থিতি নিয়ে নিয়ে কোনও মন্তব্য করেননি তিনি।
বৃহস্পতিবার সকালে রাজ্য সরকার এবং তৃণমূলের ‘পরামর্শদাতা’ সংস্থা আইপ্যাকের সেক্টর ফাইভের দফতরে এবং প্রতীকের লাউডন স্ট্রিটের বাড়িতে হানা দেন ইডি আধিকারিকেরা। প্রথমে প্রতীকের বাড়ি এবং তার পরে আইপ্যাকের দফতরে পৌঁছোন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। দুই জায়গা থেকেই কিছু ফাইল নিয়ে এসে তিনি অভিযোগ করেন, তাঁদের নির্বাচনী কৌশল জেনে নিচ্ছে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা। সমস্ত ল্যাপটপ, আইফোন, তথ্য ইত্যাদি ফরেন্সিক টিম নিয়ে এসে নিজেদের হেফাজতে ‘ট্রান্সফার’ করেছে। প্রসঙ্গত, রাজ্য প্রশাসনের আধিকারিকদের পাশাপাশি অভিষেক এবং তাঁর দফতরের সঙ্গেও সমন্বয় রেখে কাজ করে আইপ্যাক। তাই অভিষেক আইপ্যাকের দফতরে বা প্রতীকের বাড়িতে ইডির তল্লাশি নিয়ে কিছু বলেন কি না, সে দিকে নজর ছিল সকলের। অভিষেক ওই বিষয়ে মন্তব্য এড়িয়ে গিয়েছেন।
বৃহস্পতিবার মালদহের সভা থেকে পরিযায়ী শ্রমিকদের সুবিধা-অসুবিধার কথা শোনেন অভিষেক। আরও এক বার অভিযোগ তোলেন, বিজেপিশাসিত রাজ্যগুলিতে পশ্চিমবঙ্গের শ্রমিকেরা বাংলায় কথা বললেই ‘বাংলাদেশি’ বলে তাঁদের উপর অত্যাচার করা হচ্ছে। কিন্তু পাশাপাশিই কংগ্রেসশাসিত রাজ্য তেলঙ্গানা এবং কর্নাটকেও পরিযায়ী শ্রমিকেরা অত্যাচারের শিকার হচ্ছেন বলে অভিযোগ করেন অভিষেক। সেই সূত্রেই তিনি তোপ দাগেন মালদহ দক্ষিণের কংগ্রেস সাংসদ ঈশা খান চৌধুরীকে লক্ষ্য করে। বলেন, “তেলঙ্গানা, কর্নাটকে তো কংগ্রেস সরকার! সেখানেও আমাদের রাজ্যের পরিযায়ী শ্রমিকদের উপর অত্যাচার করা হচ্ছে। মালদহ উত্তরের কংগ্রেস সাংসদ ঈশা খান চৌধুরী তার জন্য ক’টা চিঠি লিখেছেন? কী ব্যবস্থা নিয়েছেন?”
অন্য দলের সঙ্গে তৃ়ণমূলের ‘পার্থক্য’ বোঝাতে গিয়েও নাম না-করে কংগ্রেসকে কটাক্ষ করেছেন অভিষেক। বলেন, “অন্য দল বিজেপির কাছে হারে। আর এই বিজেপি তৃণমূলের কাছে হারে।” বিহারের বিধানসভা ভোটের প্রসঙ্গ টেনে অভিষেকের সংযোজন, “মানুষ একজোট থাকলে বিজেপি ভেঙে যায়। আর মানুষ বিভক্ত হলে বিজেপি জিতে যায়। যেমনটা বিহারে দেখা গিয়েছে।”
প্রসঙ্গত, সদ্যই মালদহের গনি পরিবারের সদস্য মৌসম বেনজির নূর তৃণমূল ছেড়ে কংগ্রেসের যোগ দিয়েছেন। অভিষেক মালদহে গিয়ে তাঁরও নাম নেননি। কিন্তু আক্রমণ করেছেন কংগ্রেসকে। যে দল থেকে মৌসম তৃণমূলে এসেছিলেন এবং তৃণমূল ছেড়ে যে দলে তিনি ফিরে গিয়েছেন। মালদহে গনি পরিবারের ‘অবদান’ রাজ্য রাজনীতিতে একটি পরিচিত ঘটনা। ইশা খানও সেই পরিবারেরই সদস্য।
সরাসরি হুমায়ুনের নাম না-নিলেও তাঁর অতীতের বিজেপি-যোগের কথা স্মরণ করিয়ে দেন অভিষেক। বলেন, “কয়েকটি দল বিজেপির সঙ্গে ডিল (বোঝাপড়া) করেছে। আপনারা সবটা জানতে পারবেন। ২০১৯ সালে এক জন বিজেপি প্রার্থী ছিলেন। এখন তিনি বাবরি মসজিদ তৈরি করছেন। মানুষকে বোকা বানিয়ে টাকা তুলছেন।” প্রসঙ্গত, ২০১৯ সালে মুর্শিদাবাদ লোকসভা কেন্দ্রে বিজেপি প্রার্থী হিসাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন হুমায়ুন। যদিও তিনি হেরে যান।
জেলা সফরে গিয়ে প্রতি দিনই বিজেপিকে নিশানা করছেন অভিষেক। বৃহস্পতিবারও তার ব্যত্যয় হয়নি। তবে তিনি যে ভাবে কংগ্রেসকে নিশানা করতেও সময় ব্যয় করেছেন, তা বিধানসভা ভোটের আগে যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ বলেই মনে করা হচ্ছে। সম্প্রতি কংগ্রেসে যোগ দিয়েছেন তৃণমূলের রাজ্যসভার সাংসদ তথা গনিখান চৌধুরীর পরিবারের সদস্য মৌসম বেনজির নূর। পাশের জেলা মুর্শিদাবাদে আবার নতুন দল জাতীয় উন্নয়ন পার্টি তৈরি করেছেন হুমায়ুন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, মালদহ এবং মুর্শিদাবাদের সংখ্যালঘু অধ্যুষিত জেলায় শাসকদলের ভোটে ভাগ বসাতে পারে কংগ্রেস এবং হুমায়ুনের নতুন দল। বিষয়টি আঁচ করেই বিজেপি বিরোধিতায় অন্য দলগুলির সঙ্গে অভিষেক তৃণমূলের পার্থক্য বোঝানোর চেষ্টা করেছেন বলে মনে করা হচ্ছে।
বাংলায় কথা বলার অপরাধে ভিন্রাজ্যে পরিযায়ী শ্রমিকদের বাংলাদেশি বলে অত্যাচার করা হলে, একই ভাষায় কথা বলার জন্য রাজ্য বিজেপি নেতাদের কেন শাস্তি দেওয়া হবে না, সেই প্রশ্ন তোলেন অভিষেক। জানান, মালদহে যে মাঠে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী সভা করবেন, সেই মাঠেই পাল্টা সভা করে পদ্মশিবিরকে ‘ট্রেলার’ দেখাবেন তিনি। ভোট মিটলে পরিযায়ীদের রাজ্যেই কাজ দেওয়ার আশ্বাস দেওয়ার পাশাপাশি যে কোনও প্রয়োজনে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করার পরামর্শও দেন অভিষেক। তাঁর জন্য সকলকে একটি নম্বরও দিয়ে দেন তিনি। সভার পর পরিযায়ী শ্রমিকদের সঙ্গে মধ্যাহ্নভোজন সারেন অভিষেক।
গত বিধানসভা ভোটে মালদহের ১২টি আসনের মধ্যে আটটিতে জয়ী হয়েছিল তৃণমূল। চারটিটে জয়ী হয় বিজেপি। সেই পরিসংখ্যান তুলে ধরে অভিষেক বলেন, “২০২১ সালে আপনারা বিজেপির অশ্বমেধের ঘোড়া আটকে দিয়েছিলেন। ভোটে হেরে ডেলি প্যাসেঞ্জাররা আবার দিল্লি পালিয়ে গিয়েছিল।” তবে ২০২৪ সালে মালদহের দু’টি লোকসভা আসনের মধ্যে একটিতেও জয়ী হতে পারেনি তৃণমূল। মালদহ উত্তরে জেতে বিজেপি, আর মালদহ দক্ষিণে কংগ্রেস। এই পরিস্থিতিতে জেলায় সংখ্যালঘু ভোটের বিভাজন আটকাতে মরিয়া রাজ্যের শাসকদল। বৃহস্পতিবার অভিষেক জয়ের লক্ষ্যমাত্রা বেঁধে দিয়ে জানিয়ে দিয়েছেন, জেলার ১২টি আসনেই জোড়াফুল ফোটাতে হবে।
